বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২০, ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ন

সংবাদের নেপথ্যে কত কী কাণ্ড -ফরিদুর রেজা সাগর

ফরিদুর রেজা সাগর

যদিও আমি চ্যানেল আই নিউজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নই, কিন্তু তার পরও আমার কাছে কিছু কিছু ফোন চলে আসে। অনুরোধ, উপরোধ।

কোনো কোনো মিষ্টিমধুর ফোন, ‘আমাকে অমুক নিউজের মধ্যে কেন রাখা হলো না।’ মৃদু ক্ষোভ, ‘আমার ছবিটা নিউজটিতে কেন দেখানো হলো না? কেন ইনসার্টে আমার ছবি নেই?’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

বেশিরভাগই এই জাতীয় ছোট ছোট আক্ষেপ।

কেউ কেউ উপরোধের সুরে বলেন, ‘আমাদের অনুষ্ঠান অমুক দিন। এটা কি দেখানো যায়? কাভারেজের জন্য একটু কি ক্যামেরাটা পাঠানো যাবে?’

গয়রহ এসব অনুরোধের পাশাপাশি গৎবাঁধা রুটিনের বাইরে অদ্ভুত রকম ফোনও আসে।

যেমন আমার এক বন্ধু মধ্যপ্রাচ্যে বড় ব্যবসায়ী। ভদ্রলোকের ছেলের বিয়ে। অনুষ্ঠানটি হলো বাংলাদেশে। সেই বিয়ের অনুষ্ঠানের দুই দিন আগে মানুষটি অ্যাকসিডেন্টে পড়েন। ওই দুর্ঘটনায় এত বড় বিবাহযজ্ঞে উনি ঠিকমতো অ্যাটেন্ড করতে পারবেন না। এই অনুপস্থিত থাকার খবরটি চ্যানেল আইয়ের খবরে বড় করে প্রচার করতে হবে। সবাই সেই খবর দেখে কপাল চাপড়াবেন। হা-পিত্যেশ করবেন। বিয়ে বাড়িটা জাঁকজমকভাবে উদযাপন হবে। শুধু ভদ্রলোককে নিয়ে সেই আসরের আনাচে-কানাচে নানা ফিসফাঁস। নানা বেদনার সঞ্চার। নিউজ হয়ে গেলে অনুষ্ঠানে আসা অতিথি স্বজনদের জনে জনে ডেকে বলতে হবে না। সবার ভারাক্রান্ত চেহারা তিনি বিছানায় শুয়ে ঠা-া ঘরে সিসি ফুটেজে তা দেখবেন। নীরবে অশ্রুপাতও করবেন। হৃদয়বিদারক হবে সেই মানবিক দৃশ্যাবলি।

এটি কীভাবে নিউজে যাবে তিনি জানেন না। জানতেও চান না। শুধু নিউজটা ভালোভাবে যাওয়া দরকার। মধ্যপ্রাচ্যে থাকা অতি সফল, বড়লোক ওই মানুষটির কঠিন আবদার রাখতে হবে। এটাই কেবল তিনি বোঝেন।

কঠিন প্রশ্ন তার, এমন গুরুত্বপূর্ণ খবর কেন প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে না?

ওনার স্পষ্ট কথা, বিজ্ঞাপন দিয়ে দিন। বিজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে এ খবরটি প্রচার হোক। তাতে দর্শকদের কাছে বিষয়টি আরও গুরুত্ববহ হয়ে উঠবে। টাকা খরচ করলে যেখানে বাঘের দুধ পাওয়া সহজ, চ্যানেল আই নিউজ কি এর চেয়ে বেশি কঠিন?

মধ্যপ্রাচ্যে এই মানুষটির অকাট্য যুক্তি, বিয়েটা তো আর পেছানো যাচ্ছে না। ওই বাস্তবতা মেনে নিয়েই জানানো হবে। খবরে বলা হবে, তিনি বিশাল যজ্ঞে আসবেন। তবে অনুষ্ঠানের এক শেষ মুহূর্তে বুড়িছোঁয়া একটু দেবেন!

এমন বিব্রতকর অবস্থায় সাধারণ মানুষকে নিয়েও মাঝে মধ্যে পড়তে হয়। আছে রাজনৈতিক বিষয়গুলো।

বেশিরভাগ যেটা হয়, প্রধানমন্ত্রী রুটিন ওয়ার্কে বিদেশ যান। যেদিন তাকে বিদেশ যেতে হয়, প্রটোকল অনুযায়ী আমাদের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা, সরকারি গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব সবাই বিমানবন্দরে যান তাকে বিদায় দিতে। প্রধানমন্ত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে তারা উপস্থিত হন অভ্যর্থনা জানাতে! দাঁড়িয়ে আছেন হয়তো ২০ জন। সময়ের সীমাবদ্ধতায় দেখানো হয় কয়েকজনকেই।

স্বাভাবিক কার্যক্রমে আমাদের নিউজটিম ক্যামেরা প্যান করে ৫-১০ জনকে দেখিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যটি ধারণ করেন এবং প্রচারের জন্য সঙ্গে সঙ্গে স্টেশনে পাঠান।

এই যে ১১ নম্বর ব্যক্তিত্বকে আমাদের দেখানো সম্ভব হলো না, তিনি তখন সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেন। বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করেন, ‘কী হলো, আপনার নিউজ ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে আমার কোনো বৈরিতা আছে?’

প্রশ্ন করি বিস্ময়ের সঙ্গে, ‘কেন, কী হয়েছে?’

উত্তর আসে, ‘শত্রুতা না হলে ক্যামেরায় আমার ছবি আসার ঠিক আগে আগে কেটে দিলেন!’

ব্যাপারটা যে ওইরকম কিছু নয়। নিউজ কাভার করতে গিয়ে দীর্ঘসময় দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। সে কারণে কেটে দিতে হয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে তা দেখে কে? এভাবে তা বোঝাতে ভীষণই বেগ পেতে হয় মাঝে মাঝে।

মাঝে মাঝে মাঝরাতে নিউজের পরিধি বাড়িয়ে হলেও তা দেখাতে হয়।

এ ধরনের আরেকটি গল্পের কথা বলছি। মনে পড়ছে ঘটনাটি। তা প্রাসঙ্গিকভাবে বলে ফেলা যায়।

আমাদের প্রিয় এক নেত্রী। বিরাট নেত্রী।

আমার সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক। তিনি মাঝে মাঝে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার হলে আমাকে ফোন করে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। কথা বলেন অনেক সময় নিয়ে।

একদিন ওই প্রিয় মানুষটি মহা ক্ষিপ্ত।

ভড়কে গেলাম ওপ্রান্ত থেকে ওনার কণ্ঠস্বর শুনে।

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে জানতে চাইলাম, ‘কী হয়েছে আপা?’

গড় গড় করে বলতে লাগলেন, ‘তোমাকে আমি এত ভালোবাসি, এত ¯েœহ করি। তোমার চ্যানেলটাই আমি যতœ করে দেখি। তার পরও এটা হচ্ছে? এই ব্যাপারটা কি?’

প্রশ্ন করি, ‘কী হচ্ছে বলুন।’

অকপটে বলে ফেললেন তিনি, ‘প্রত্যেকবার তুমি, তোমার নিউজ টিম আমাকে বাদ দিয়ে দাও। এ রকমই হচ্ছে আজকাল।’

বললাম, ‘কেমন? আপনাকে বাদ দেবে মানে?’

বললেন তিনি, ‘তুমি কি জানো, প্রধানমন্ত্রী যখন, যে দেশে, যে সময়ে যান, বিমানে ওঠার আগ মুহূর্তে তিনি আমার সঙ্গে আলিঙ্গন করেন? জানো সেটা? তুমি জানবে কী করে? দেশের সব দর্শকের কাছেই ব্যাপারটা অজানা। দেশের মানুষের কাছে এই বিরাট ঘটনাটি অজানা।’

চুপ করে নেত্রীর কথা শুনছিলাম।

বলছিলেন, ‘আলিঙ্গন করে বিমানের সিঁড়িতে ওঠা মানে এক অর্থে আমাকেই তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দেন।’

বললাম, ‘হুম। কথা সত্য।’

তিনি জানালেন, ‘এই দৃশ্যটা তোমরা খবরে কেটে দাও কেন?’

প্রতিবাদের সুরে বললাম, ‘তাই তো! এটা কাটার কী আছে। তা কেন কাটবে নিউজ এডিটর?’

জোরের সঙ্গে বললেন, ‘আমি কি তাহলে মিথ্যা বলছি?’

মহাক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন তিনি নিমিষে।

ব্যাপারটা কী ভাবতে বসলাম আমি। এ দৃশ্যটা তো কাটার কিছু নেই। আমি খোঁজ নিয়ে জানলাম, এমন গুরুত্বপূর্ণ মহিলার ফুটেজ কেটে ফেলে দেওয়ার কোনো ঘটনা তো ঘটে না। কাটার কোনো প্রশ্নই নেই।

তা হলে ব্যাপারটা কী? তার এ অভিযোগ তো বাতাস থেকে আসাও নয়। সত্যতা যাচাই না করে এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা প্রিয় মানুষটির তো বলার কথা নয়!

খোঁজ। খোঁজ। খোঁজ।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, প্রধানমন্ত্রী বিমানে ওঠার ঠিক আগ মুহূর্তে ভদ্রমহিলার সঙ্গে সৌজন্যবশত আলিঙ্গন করেন। এখানে কোনো মেকিত্ব নেই। এটাও দারুণ সত্য।

সেই জায়গাটি হচ্ছে, চূড়ান্ত সিকিউরিটি জোন। একেবারে কোনো ক্যামেরাম্যান কী নিউজম্যানের সেখানে পৌঁছানোর সাধ্য নেই। মানুষ তো দূরের কথা, কোনো ক্যামেরার প্রবেশাধিকার নেই।

ফলে সেই দুর্লভ দৃশ্যটি আমাদের চিত্রগ্রাহক ধারণ করতে পারেন না।

সে কারণে, যখনই প্রধানমন্ত্রীর দেশের বাইরে যাওয়া ও ফেরত আসার সংবাদ পরিবেশিত হয়, সংবাদ বিভাগ তা দেখাতে সক্ষম হয় না। প্রটোকল ভেঙে কোনো কিছু ধারণ করা তো অসম্ভব।

বিষয়টি জেনে তাকে জানালাম।

তিনি মাথা নেড়ে বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। জানা হলো ব্যাপারটা।

এর পর থেকে যা দাঁড়াল, তা হলো, উনিও সেখানে দাঁড়াতে শুরু করলেন। প্রধানমন্ত্রী সেখান থেকে, তার কাছ থেকে বিদায় গ্রহণ করেন।

তখন থেকে তার ছবিটা আমাদের নিউজক্যামেরায় যথারীতি ধারণ করা হয়। এবং সেটা অনএয়ারে গেলে তিনি মহা আনন্দিত হন। সেদিন থেকে দৃশ্যপটে আসা মাত্র তিনি আমার কাছে আনন্দ প্রকাশ করেন। তার ছবি এখন নিউজে সব সময় দেখা যাচ্ছে।

এ রকম আরও একটি ঘটনা মনে পড়ছে।

সেটা হলো, ঢাকা শহরের একটি কলেজ। সেই নতুন কলেজে ছাত্রছাত্রীরা সেই বছর পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করেছে।

কলেজের প্রতিষ্ঠাতা-প্রিন্সিপাল আমাকে খুশি হয়ে ফোন করলেন।

ফোন ধরে ওপাশে তার উষ্ণ কণ্ঠ বুঝতে পারলাম। বললাম, ‘জি, বলুন, কেমন আছেন?’

গদগদ হয়ে বললেন, ‘আমার কলেজের স্টুডেন্ট এত ভালো ফল করেছে। তুমি কি একটা নিউজক্যামেরা পাঠাবে না?’

জানালাম বিনয়ের সঙ্গে, ‘নিশ্চয়ই পাঠাচ্ছি। আপনার কলেজ এত ভালো রেজাল্ট এনেছে। ক্যামেরা পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

সংবাদ বিভাগকে বললাম।

তারা একটা ক্যামেরা আর রিপোর্টার দিল সেই কলেজ আঙিনায়। যথারীতি সেখানে রিপোর্টার গেলেন। ক্যামেরা গেল।

সন্ধ্যাবেলায় খবরটি প্রচার হয়ে গেল।

খবরটি প্রচার হওয়ামাত্র ফোন এসে গেল আমার কাছে।

প্রচ- ক্ষিপ্ত। তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠার মতো কণ্ঠস্বর তার।

আকাশ থেকে পড়লাম, ‘আমি তো দেখলাম আপনার খবর গেছে। এত রাগের কী আছে?’

সঙ্গে সঙ্গে ওপাশে প্রত্যুত্তর, ‘আমার খবর গেছে মানে?’

বললাম, এই যে আপনার কলেজের খবরটি গেল। ভালো ফল করেছে। সবকিছুই তো ঠিকঠাক, বিস্তারিত গেছে।’

প্রিন্সিপাল সাহেব জানালেন, ‘আমি তো সেটার জন্য তোমাকে বলি নাই।’

ভড়কে গিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ এপাশে আমি।

বুঝে উঠতে পারছিলাম না ওনার কী বক্তব্য।

আস্তে গলায় বললাম, ‘আমি আসলে দুঃখিত, কী জন্য তা হলে বলছেন? মাফ করবেন, আমি সত্যি বুঝতে পারছি না কী হয়েছে, তা খুলেমেলে কি বলবেন?

আমার নিরুত্তেজিত, বিনয়ী প্রশ্নে এবার তার ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত হলো।

বললেন, ‘শোনো, যে কলেজের কাভারেজ দিয়েছ তুমি, সেই কলেজটা আসলে কার?’

বললাম, ‘আপনার।’

ভদ্রলোক বললেন, ‘রাইট’। সে কলেজটা হলো আমার নামে, আমি কলেজের সভাপতি। ঠিক?

‘একদম ঠিক।’

‘আমি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। আমার যোগ্য ব্যবস্থাপনায় কলেজটি ভালো করে যাচ্ছে। ঠিক?’

‘জি, ঠিক।’

‘কলেজটি এবার ঈর্ষণীয় ভালো রেজাল্ট করেছে।’

‘একদমই ঠিক বলছেন। সে কারণেই তো রিপোর্ট করা। ক্যামেরায় তা তুলে ভালোভাবে, সবিস্তারে নিউজে গেছে।’

‘তো? আমি তো সেটা তোমাকে বলি নাই। তার পর?’

‘তার পর কী। বুঝতে পারছি না! কী করব?’

‘কলেজের ছেলেরা ভালো করেছে, আমার জন্য করেছে। সবকিছু প্রতিষ্ঠা করেছি আমি। তো? সাক্ষাৎকার নেবে তো আমার। আমার কাছেই কোনো ক্যামেরা এলো না। আমার সঙ্গে কোনো বাক্যব্যয় হলো না। কোনোই ইন্টারভিউ নিল না আমার। ছাত্রদের সাকসেস দেখিয়ে লাভ কী?’

এপাশে আমি তার কথায় তখন নীরব।

‘প্রথমত, আমার কাছে আসবে। আমার সঙ্গে কথা বলবে। আমার কলেজ প্রসঙ্গ এলে আমার সাক্ষাৎকার না দেখিয়ে তার নিউজ করলে সেটা তো হবে অর্ধেক। তবেই না আমি বুঝব, শ্রোতা-দর্শক দেখে বুঝবে এই সংবাদটার একটা গুরুত্ব আছে।’

এসব সংবাদ, সংবাদের নেপথ্যের ঘটনা নিয়ে কতকিছুই না ঘটে!!

 

ফরিদুর রেজা সাগর : শিশুসাহিত্যিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব


© ২০১৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত সময়ের কন্ঠ লিঃ
কারিগরি সহায়তায় N Host BD