বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০, ০১:৩৮ পূর্বাহ্ন

লকডাউন শিথিলে ব্যাপক গণসংক্রমণের আশঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক: গত মাসের মাঝামাঝি থেকেই দেশে নতুন করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছিল। মে মাসে তা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করেছে।গতকাল ২৪ ঘন্টায় রেকর্ড ৮৮৭ জন আক্রান্তের ও ৮ জন মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বুলেটিনে।এ আশঙ্কা বিশেষজ্ঞরা এপ্রিল মাসেই করেছিলেন।তারা সতর্ক করে বলেছিলেন, মে মাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়তে পারে।এরফলে দেশে ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কার কথা তারা বলেছিলেন। তারা সতর্ক করে বলেছিলেন, লকডাউন শিথিল করলে ভয়ংকর গণসংক্রমণ শুরু হতে পারে, যা ঠেকানোর মতো চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক সরঞ্জামাদি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা আমাদের নেই।যেহেতু করোনা ভাইরাসের নেই নির্দিষ্ট ওষুধ, ভ্যাকসিন, তাই আমাদের সবচেয়ে বড় ভরসা শতভাগ লকডাউন কার্যকর করা, আর বেশি বেশি পরীক্ষা করে সংক্রমিতদের আলাদা করা। অর্থাৎ তাদের আইসোলেশনে রাখা।এছাড়া প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ হাজার টেস্ট করানো ও আক্রান্তদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে রাখার তাগিদও দিয়েছিলন বিশেষজ্ঞরা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, যেহেতু লকডাউন কেউ মানছেন না, তাই আগামী মে মাস আমাদের জন্য খুবই ক্রিটিক্যাল হতে পারে।

তিনি আরো বলেছিলেন, যেসব এলাকায় রোগী শনাক্ত হয়েছে সেখানে শতভাগ লকডাউনের পাশাপাশি এসব রোগী কোথায় এবং কার কার সঙ্গে মিশেছেন সেটি বের করতে হবে। আর পরীক্ষার পরিধি বাড়াতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন বলেছিলেন, মে মাস খুবই ক্রিটিক্যাল হবে।বাস্তবে হয়েছেও তাই।টেস্টের সংখ্যা পাঁচ/ছয় হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেও আক্রান্তের সংখ্যা ৮শ ছাড়িয়ে যাচ্ছে।পরীক্ষা বাড়ানো হলে এই সংখ্যা নিঃসন্দেহে আরো বাড়বে।

সংক্রমণের এমনি ঊর্ধ্বমুখি অবস্থাতেই শিথিল করে দেওয়া হয়েছে লকডাউন।অধিকাংশ গার্মেন্টস খুলে দেওয়া হয়েছে, বাকিগুলো খোলার অপেক্ষায়। শ্রমিকরা ঢাকায় আসছেন দলে দলে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকানপাট খোলা রাখার সময় বাড়ানো হয়েছে। দেওয়া হয়েছে ইফতার বিক্রির অনুমতি। গতকাল থেকেই শর্তসাপেক্ষে খুলে দেওয়া হয়েছে দোকানপাট ও শপিংমল। এসব সিদ্ধান্তে অনেক বিশেষজ্ঞই বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, সংক্রমণের চরিত্র দেখে এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, মে মাস হবে বাংলাদেশের জন্য খুবই ‘ক্রিটিক্যাল’। তারা বলছেন, আগামী তিন সপ্তাহ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। দেশে করোনার সংক্রমণের ক্ষেত্রে সরকার যে ভবিষ্যত্ চিত্রের খসড়া করেছে সেখানেও দেখানো হয়েছে, মে মাসের শেষ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছাতে পারে ১ লাখে। তাহলে কেন খুলে দেওয়া হচ্ছে সবকিছু—এর উত্তর জানা নেই কারো। এ নিয়ে বলতে গিয়ে ‘আসলেই কি বাংলাদেশে লকডাউন চলছে’ সেই প্রশ্ন তুলে এক জন ভাইরোলজিস্ট বলেন, এমনিতে মানুষকে ঘরে রাখা যায়নি, তার ওপর আবার সবকিছু খুলে দেওয়া হচ্ছে। এভাবে ঝুঁকি বাড়বে বৈ কমবে না। যারা ঘরে বসে আছে তারা ভাববে, গার্মেন্টসকর্মীরা তো দিব্যি কাজ করছে তাহলে আমরা বসে থাকব কেন। এ কারণে সামনে ভয়ংকর দিন অপেক্ষা করছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, লকডাউন শিথিল করায় আশঙ্কাজনক হারে করোনা আক্রান্ত রোগী বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনিতেই মানুষ লকডাউন মানতে চায় না। তিনি বলেন, বাঁচতে চাইলে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। মানুষ নিজে সচেতন না হলে পুলিশ দিয়ে সবকিছু করা যায় না। এক্ষেত্রে তিনি চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের জনগণের লকডাউন মেনে চলার উদাহরণ তুলে ধরেন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মজিবুর রহমান বলেন, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে যখন লকডাউন মানতে কঠোর হওয়া দরকার, তখন লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। রাজধানী আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। সব জায়গায় মানুষের ভিড়। এ জন্য সামনে আমাদের খারাপ দিন অপেক্ষা করছে। গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার পর সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাঁচতে চাইলে ঘরে থাকুন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।

গতকাল থেকে শপিংমল ও দোকানপাট খুলে দেওয়ায় রাজধানীসহ সারাদেশে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছে মানুষ। সরকারঘোষিত চলমান সাধারণ ছুটিতে ঘর থেকে বের হওয়া নিষিদ্ধ হলেও মানুষ রাস্তায় নামছে। সামাজিক দূরত্ব মানছে না। সবচেয়ে বেশি শৈথিল্য চলছে হাটবাজারে। শরীর ঘেঁষে ভিড় করে কেনাকাটা করা হচ্ছে। জটলা হচ্ছে। এ সময় সুরক্ষা সরঞ্জামাদি ব্যবহার করতেও দেখা যাচ্ছে না অধিকাংশ মানুষকেই। ক্রেতারা মাস্ক ব্যবহার করলেও হাটবাজারের বিক্রেতাদের মধ্যে মাস্ক পরার প্রবণতা একেবারেই কম। এছাড়া সারাদেশেই ন্যায্যমূল্যে টিসিবির পণ্য কিনতে আসা মানুষও সামাজিক দূরত্ব মানছে না। ট্রাকের সামনে ভিড় ধাক্কাধাক্কি করে মানুষ এসব পণ্য কিনছে। গ্রামাঞ্চলে ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খলা চলছে। ত্রাণ পেতে মানুষ কোনো নিয়ম মানছে না। এ সময় স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন উপস্থিত থাকলে সামাজিক দূরত্ব কিছুটা বজায় রাখা হলেও অন্য সময় তা একেবারেই মানা হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় কেনাকাটার বাইরেও মানুষ চায়ের দোকানে এখনো আড্ডা দিয়ে যাচ্ছে।

প্রসঙ্গত, কঠোরভাবে লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশন মেনে চলায় চীনের পার্শ্ববর্তী দেশ হওয়া সত্ত্বেও এখনো পর্যন্ত ভিয়েতনামে করোনায় কেউ মারা যায়নি। সাড়ে ৯ কোটি মানুষের সে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা মাত্র ২৬৮।


মুজিব বর্ষ

মুজিববর্ষ
© ২০১৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত সময়ের কন্ঠ লিঃ
কারিগরি সহায়তায় N Host BD